‘অধিকাংশ মানুষ জিহ্বার পদস্খলনের কারণে জাহান্নামে যাবে’

জিহ্বার দ্বারা দ্বীন শিক্ষা দাও: যদি এই জিহ্বার দ্বারা তুমি কাউকে দ্বীনের ছোট একটি কথাও শিক্ষাদান কর। যেমন এক ব্যক্তি ভুল পদ্ধতিতে নামাজ পড়ছিল আর তোমার জানা ছিল যে, সে ভুল পদ্ধতিতে নামাজ পড়ছে। তাই তুমি চুপে চুপে নির্জনে নম্রভাবে মহব্বত ও দয়ার সঙ্গে তাকে বুঝিয়ে দিলে যে, ভাই! তোমার নামাজে এই ভুল ছিল, এভাবে আদায় করে নাও।

তোমার জিহ্বার এই সামান্য নড়াচড়ায় তার সংশোধন হয়ে গেল। আর সে সঠিকভাবে নামাজ পড়তে শুরু করে দিল। তাহলে এখন গোটা জীবনে যত নামাজ সে সঠিকভাবে পড়বে, সে সবের বদলা সওয়াব তোমার আমলনামাতেও লেখা হবে।

সান্তনার বাক্য বলা: কোনো এক ব্যক্তি দুঃখ কষ্টের মাঝে লিপ্ত। তুমি তার পেরেশানী দূর করার জন্য তাকে সান্তনার কোন কথা, কোন উপদেশ বলে দিলে, যার ফলে তার কিছু সাহস হল, তার কিছু সান্তনা এল, তাকে এ কথা বলা তোমার জন্য বড়ই সওয়াব ও বিনিময় নিয়ে আসল। যেমন এক হাদিসে রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি এমন নারীকে সান্তনার বাক্যবলে, যার ছেলে নিখোঁজ হয়ে গেছে বা মারা গেছে, তাহলে আল্লাহ তায়ালা ওই সান্তনা দানকারীকে জান্নাতে বড়ই দামী মূল্যবান জামাজোড়া পরিধান করাবেন।’ উদ্দেশ্য হলো এই জিহ্বাকে নেক কাজে ব্যবহার করার যে পথ আল্লাহ তয়ালা রেখেছেন, তাতে তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার কর। তারপর দেখবে যে, তোমাদের আমলনামায় কীভাবে সওয়াবের স্তুপ লেগে যায়। যেমন কোনো ব্যক্তি যাচ্ছিল তুমি তাকে পথ দেখিয়ে সঠিক পথ বলে দিলে, এই ছোট কাজটি করলে এবং তোমার খেয়ালও হয়নি যে, আমি কোন নেকীর কাজ করেছি, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তার বিনিময়ে অসংখ্য সওয়াব দান করবেন।

যাহোক, যদি এক ব্যক্তি এই জিহ্বাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে, তাহলে বিশ্বাস করুন, তার জন্য জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাবে এবং তার অগণিত গুনাহের ক্ষমাপ্রাপ্তির উসিলা হয়ে যাবে; কিন্তু আল্লাহ না করুন যদি এই জিহ্বার অবৈধ এবং ভুল ব্যবহার হয়, তাহলে এই জিহ্বাই মানুষকে জাহান্নামে টেনে নিয়ে যাবে।

জিহ্বা জাহান্নামে নিয়ে যাবে: এক হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, যত লোক জাহান্নামে যাবে তাদের মাঝে অধিকাংশেই তারা হবেন যারা তাদের জিহ্বার পদস্খলনের কারণে জাহান্নামে যাবে। যেমন মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা কাউকে দুঃখ দেয়া, কারো মনে আঘাত দেয়া, অন্যের সঙ্গে গীবতে অংশগ্রহণ করা, কারো কষ্টের ওপর আনন্দ প্রকাশ করা ইত্যাদি। যখন এ গুনাহের কাজ করে তখন এর ফলে সে জাহান্নামে চলে যাবে। হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘অধিকাংশ মানুষ জিহ্বার পদস্খলনের কারণে জাহান্নামে যাবে।’ (তিরমিযী, কিতাবুল ঈমান, হাদিস নম্বর: ২৬১৬)।

তাই এই জিহ্বাকে যা আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দান করেছেন, তাকে সামান্য ভেবে চিন্তে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য বলেছেন যে, জিহ্বা দ্বারা হয়ত সঠিক কথা বলো, অন্যথায় চুপ থাক। কেননা চুপ থাকা এর চেয়ে হাজার গুণ উত্তম যে, মানুষ ভুল কথা জিহ্বা থেকে বের করবে।

প্রথমে ভেবে নাও তারপর বল: এ কারণেই অধিক কথা বলতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা যদি মানুষ অধিক বলে তাহলে জিহ্বা আয়ত্বে থাকে না, কিছু না কিছু গড়বড় অবশ্যই হয়ে যায়। যার ফলে মানুষ গুনাহে লিপ্ত হয়ে থাকে। এজন্য প্রয়াজন মত কথা বলো। অধিক বলবে না। এক বুযুর্গ বলেছেন যে, প্রথমে কথাকে ভেবে দেখ, তারপর বলো। যখন মেপে মেপে কথা বলা হবে তখনই এ জিহ্বা আয়ত্বে এসে যাবে।

হজরত মিয়া সাহেব (রহ.) এর আলোচনা: হজরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) এর একজন ওস্তাদ ছিলেন হজরত মিয়া আসগর হুসাইন (রহ.)। (আল্লাহ তার মস্তককে সমুন্নত করুন) বড়ই উঁচু মানের বুযুর্গ ব্যক্তি ছিলেন তিনি। তিনি ‘মিয়া সাহেব’ নামেই প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি এমন বুযুর্গ ছিলেন যা সাহাবায়ে কেরামের যমানার স্মরণ করে দিতেন। মুহাম্মদ শফী (রহ.) তার সঙ্গে বিশেষভাবে সম্পর্ক রাখতেন এবং তার খেদমতের জন্য বড় বেশি গুরুত্ব দিয়ে হজরত মিয়া সাহেবও মুহাম্মদ শফী (রহ.)-কে বড়ই মহব্বত করতেন।

মুহাম্মদ শফী (রহ.) বললেন যে, একবার হজরত মিয়া সাহেবের খেদমতে উপস্থিত হলাম এবং গিয়ে তার পাশে বসে গেলাম। তখন হজরত মিয়া সাহেব (রহ.) বলতে লাগলেন যে, দেখ, মৌলভী শফী সাহেব আজ আমরা আরবিতে কথাবার্তা বলব, উর্দূতে কথা বলব না। হজরত আব্বাজান বলেন যে, আমার বড়ই হয়রানী মনে হচ্ছিল। ইতোপূর্বে আর এমনটি কখনো হয়নি।

আজ এসে বসতেই এই আরবিতে কথাবার্তা বলার খেয়াল কেন এল, আমি বললাম, হযরত! কারণ কি? হযরত বললেন না, এমনিতেই মনে আসল যে, আরবিতে কথাবার্তা বলবো। যখন আমি অনেক পীড়াপীড়ি করলাম তখন বললেন, মূলত কথা হলো এই, আমি দেখেছি যে, যখনই আমরা দু’জন একত্রে বসি, তখন অনেক কথাবার্তা-আলাপ চলে থাকে, এদিক সেদিকের কথাও শুরু হয়ে যায়, যার ফলে আমরা অনেক সময় ভুল কথার মাঝেও লিপ্ত হয়ে পড়ি। আমার খেয়াল হলো যে, যদি আমরা আরবিতে কথাবার্তা বলতে গুরুত্ব দেই তাহলে যেহেতু আমিও আরবিতে ঝটপট কথা বলতে পারি না এবং একই অবস্থা আপনারও। তাই কিছু কষ্টের সঙ্গে আরবিতে দু’জনকেই কথা বলতে হবে। যার ফলে এই জিব্হা যে লাগামহীন হয়ে যাচ্ছে তা আয়ত্বে চলে আসবে এবং বিনা প্রয়োজনে বাড়তি কথা বলা হবে না। শুধু প্রয়োজনের কথাই বলা হবে।

আমাদের দৃষ্টান্ত: তারপর হজরত মিয়া সাহেব (রহ.) বললেন, ভাই! আমাদের দৃষ্টান্ত তো ওই ব্যক্তির মত, যে তার ঘর থেকে সব টাকা পয়সা নিয়ে সফরে রওয়ানা হয়েছিল, এখনো তার সফর চলছে, এখনো গন্তব্যে পৌঁছতে পারে নাই। এমন সময় তার সব টাকা পয়সা খরচ হয়ে যায়। সামান্য কিছু টাকা তার কাছে অবশিষ্ট আছে। এখন সে এ টাকাগুলো অত্যন্ত হিসাব করে গুণে গুণে খরচ করচে যেন কোনভাবে নিজ বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারে।

তারপর বললেন, আমরা নিজেদের বেশির ভাগ বয়স অতিক্রম করেছি। আল্লাহ তায়ালা জীবনের যে মূহুর্তগুলো দান করেছিলেন, এগুলো বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছার জন্য যেসব টাকা-পয়সা ছিল যদি এগুলো সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করতাম, তাহলে ঠিকানা পর্যন্ত পৌঁছা সহজ হয়ে যেত। কিন্তু আমার তো খবর নাই, কোন কোন বস্তুতে এগুলো ব্যয় করেছি। বসে বসে গল্পগুজবে সময় অতিবাহিত করছি। অনুষ্ঠান একের পর এক চলছেই। বাজারী কথাবার্তাও হরদম বলেই যাচ্ছি। যার ফলাফল হচ্ছে এই যে, সব শক্তিই ওই আজেবাজে কাজকর্মে বয় হয়ে গেছে। এখন তো জানা নেই যে, জীবনের আর ক’দিন বাকী আছে? এখন তো মনে চায় যে, জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত হিসাব করে, গুরুত্ব দিয়ে, গুণে গুণে ব্যবহার করব। যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা এই চিন্তা দান করেছেন, তাদের তো এ অবস্থাই হয়ে যায়, তারা তো এই চিন্তাই করেন যে, যখন আল্লাহ তায়ালা জিহ্বার  এই দৌলত দান করেছেন, তখন তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করব। ভুল পথে ব্যয় করব না।

জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চিকিৎসা: জিহ্বাকে বশ করার ব্যবস্থা করেছিলেন হজরত সিদ্দীকে আকবর (রাযি.)। যিনি আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণের পরেই সর্বোত্তম ব্যক্তি। তিনি একবার নিজের জিহ্বাকে ধরে বসলেন এবং তাকে মোচড়াচ্ছিলেন। লোকেরা জিজ্ঞেস করলেন যে, আপনি এমন করছেন কেন?

উত্তরে তিনি বললেন, ‘এ জিহ্বা আমাকে বড়ই ধ্বংসের মাঝে ফেলে দিচ্ছে।’ এজন্য আমি তাকে বশকরণের চেষ্টা করছি। অপর বর্ণনায় আছে যে, নিজের মুখে পাথরের টুকরা রেখে বসে আছেন। যেন বিনা প্রয়োজনে জিহ্বা থেকে কথা বের না হয়। যা হোক, জিহ্বা এমন বস্তু যে, তার দ্বারা মানুষ জান্নাতও কামাই করতে পারে এবং দোজখও কামাই করতে পারে। তাকে আয়ত্ব করা প্রয়োজন, যেন তা অপাত্রে ব্যবহৃত না হয়। তার পদ্ধতি এই যে, অধিক কথা বলা থেকে মানুষ বেঁচে থাকবে। কেননা মানুষ যত বেশি কথা বলবে ততবেশি গুনাহে লিপ্ত হবে। সুতরাং নিজেদের সংশোধন প্রত্যাশী ব্যক্তিগণের যখন কোনো শায়খের দরবারে চিকিৎসার জন্য যাবে তখন শায়খ প্রত্যেকের জন্য উপযোগী পৃথক পৃথক ব্যবস্থাপত্র প্রণয়ন করে দেন এবং অধীকাংশ মানুষকে শুধু জিহ্বাকে সংযত করণের চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপত্র বাতলিয়ে দেন।

জিহ্বায় তালা লাগাও: এক ব্যক্তি হজরত মুফতী শফী সাহেবের (রহ.) দরবারে আসতেন কিন্তু কোনো ইসলাহ বা সংশোধনীর সম্পর্ক কায়েম করেননি। শুধু এমনি দেখা সাক্ষাতের জন্য আসা-যাওয়া করতেন। আর যখন কথা শুরু করতেন তখন আর থামার নামও নিতেন না। এক ঘটনা শেষ তখনই দ্বিতীয় ঘটনা শুনানো শুরু করে দিতেন। মুহাম্মদ শফী (রহ.) সহ্য করতে থাকতেন। একদিন তিনি মুহাম্মদ শফী (রহ.) কাছে আবেদন করলেন যে, আমি আপনার সঙ্গে ইসলাহের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আব্বাজান মুহাম্মদ শফী (রহ.) তা গ্রহণ করলেন এবং অনুমতি দিয়ে দিলেন। তারপর তিনি বললেন যে, জনাব! আমাকে কিছু অযিফা পড়ার জন্য বলে দিন, কী পড়ব?

মুহাম্মদ শফী (রহ.) বললেন যে, তোমার একটাই অযিফা আর তা হলো এই যে, এই জিহ্বার ওপর তালা লাগাও আর এই জিহ্বা যা সর্বক্ষণ চলতে থাকে তাকে বশ কর। তোমার জন্য আর কোনো অযিফা নেই। যখনই সে জিহ্বাকে বশ করে নিল তার দ্বারই তার ইসলাহ হয়ে গেছে।

গল্প গুজবে জিহ্বাকে লাগানো: আমাদের এখানে জিহ্বার  ভুল ব্যবহারের যে বিপর্যয় চলছে, স্মরণ রাখতে হবে, এটি বড়ই বিপদসঙ্কুল কথা। বন্ধু-বান্ধব ডেকে এনেছে যে, এসো কিছুক্ষণ বসে গল্প-গুজব করব। এ গল্প-গুজবে মিথ্যা বলা হচ্ছে। এতে গীবত হয়ে যাচ্ছে। অন্যের মন্দচারী বলা হচ্ছে। অন্যের ছিদ্রান্বেষণ করা হচ্ছে। যার ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, আমাদের একটি বৈঠক কত গুনাহের সমষ্টি হয়ে যায়। এজন্য সর্বপ্রথম কাজ হলো এই জিহ্বাকে আয়ত্বে আনার গুরুত্ব অনুধাবন করা। আল্লাহ তায়ালা স্বীয় কৃপায় তার গুরুত্ব আমাদের অন্তরে সৃষ্টি করে দিন। আমীন।

নারী এবং জিহ্বার ব্যবহার: এমনিতেই গোটা সমাজ এই জিহ্বার  গুনাহে লিপ্ত। কিন্তু হাদিসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের মাঝে যেসব রোগ প্রাপ্তির নির্দেশনা দিয়েছেন। তার অন্যতম একটি হলো এই যে, তাদের জিহ্বা আয়ত্বে আসে না।

হাদিসে এসেছে, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের প্রতি সম্বোধন করে বললেন, হে নারীগণ! আমি জাহান্নামবাসীদের বেশির ভাগ সংখ্যায় তোমাদেরকে পেয়েছি অর্থাৎ জাহান্নামে পুরুষের চেয়ে অধিক পরিমাণে রয়েছে নারীগণ। উপস্থিত নারীরা প্রশ্ন করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এর কারণ কী? তখন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে জানালেন: ‘তোমরা লানত অভিশাপ বেশি করে থাক এবং স্বামীদের অকৃতজ্ঞতা বেশি কর।’ এ কারণে জাহান্নামে তোমাদের সংখ্যা অধিক। দেখুন, এ হাদিসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে দু’টি কথা বর্ণনা করেছেন এ উভয়টির সম্পর্ক জিহ্বার সঙ্গে। অভিশাপের আধিক্য এবং স্বামীদের অকৃতজ্ঞতা। জানা গেল, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের মাঝে যে রোগের নির্ণয় করলেন, তাতে জিহ্বার  অপব্যবহারকে উল্লেখ করেছেন যে, মহিলাগণ জিহ্বার  ভূল ব্যবহার করে। যেমন কাউকে অভিশাপ দিয়ে দিলো, কাউকে মন্দ বলে দিলো, কারো গীবত করে দিলো, কারো কুটনামী দুর্নাম করলো এ সবই এর মাঝে অন্তুর্ভুক্ত।

আমি বেহেশতের গ্যারান্টি দিচ্ছি: ‘হজরত সাহল ইবনে সাদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে দু’টি জিনিসের গ্যারান্টি দেবে তাহলে আমি তাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিচ্ছি। এক ওই জিনিসের গ্যারান্টি দেবে যা তার উভয় চোয়ালের মাঝখানে আছে অর্থাৎ জিহ্বা। এটির ভুল ব্যবহার হবে না, এ জিহ্বা দ্বারা মিথ্যা বেরুবে না, গীবত হবে না, কারো মনে কষ্ট দেয়া হবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। আর অপর যে বিষয়ে গ্যারান্টি দিতে হবে তাহল, যা দুই রানের মাঝখানে আছে অর্থাৎ লজ্জাস্থান। তাকে ভুল স্থানে ব্যবহার করা হবে না। তাহলে আমি তাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিচ্ছি। এতে বুঝা গেল যে, জিহ্বার সংরক্ষণ দ্বীন সংরক্ষণের অর্ধেক অধ্যায়। কারণ অর্ধেক পাপ জিহ্বা দ্বারাই হয়। এজন্য এটির সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

মুক্তির তিনটি কাজ: ‘হজরত উকবা ইবনে আমের (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম। ইয়া রাসূলাল্লাহ! নাজাতের পদ্ধতি কী? অর্থাৎ পরকালে জাহান্নামের শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি এবং আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি এবং জান্নাতে প্রবেশের পদ্ধতি কী?

তখন রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ প্রশ্নের জবাবে তিনটি বাক্য ইরশাদ করলেন। প্রথম বাক্যটি এই বললেন যে, ‘তোমরা তোমাদের জি্বিাকে নিজের আয়ত্বে রাখ’, যেন জিহ্বা আয়ত্বের বাইরে না যেতে পারে। আর দ্বিতীয় বাক্যটি এই বললেন যে, ‘তোমাদের ঘরই তোমাদের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।’ অর্থাৎ নিজের বেশির ভাগ সময় ঘরে অতিবাহিত করবে। বিনা প্রয়োজনে তোমরা ঘর থেকে বেরুবে না। শুধুমাত্র প্রয়োজন হলে ঘর থেকে বাইরে যাবে। কেননা এমনটি করলে বাইরের ফেতনা-ফাসাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গুনাহের ওপর কাঁদ: আর তৃতীয় বাক্য এই ইরশাদ করলেন যে, ‘যদি কোনো ভুল, গুনাহ ত্রুটি তোমার থেকে প্রকাশ হয়ে পড়ে, তাহলে ওই ভুলের জন্য কান্নাকাটি কর।’ কান্নার উদ্দেশ্য এই যে, তা থেকে তাওবা কর এবং এজন্য লজ্জা প্রকাশ করে ইস্তিগফার কর। কান্নার অর্থ এই নয় যে, প্রকৃত অর্থেই কান্নাকাটি করতে হবে। যেমন কয়েকদিন আগে এক ব্যক্তি আমাকে বলতে লাগল যে, আমার কান্নাই আসে না। এজন্য আমি অস্থির হয়ে গেছি। মূলকথা হলো এই যে, নিজ থেকে যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে কান্না না আসে তাহলে এতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু গুনাহের ওপর অন্তরে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে তাওবা ও ইস্তিগফার কর যে, হে আল্লাহ! আমার ত্রুটি হয়ে গেছে, আপনি ক্ষমা করে দিন।

হে জিহ্বা! আল্লাহকে ভয় কর: ‘হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, যখন সকাল হয় তখন মানুষের দেহের মাঝে যত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে তারা সবাই জিহ্বাকে সম্বোধন করে এই বলে যে, হে জিহ্বা, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। এজন্য আমরা তো তোমার অধীন। যদি তুমি সোজা থাক তাহলে আমরাও সোজা থাকব। আর যদি তুমি বাঁকা হয়ে যাও তাহলে আমরাও বাঁকা হয়ে যাব।’

উদ্দেশ্য এই যে, মানুষের গোটা দেহ জিহ্বার  অধীন হয়, জিহ্বা যদি ভুল কাজ করতে শুরু করে তাহলে এর ফলে গোটা দেহই গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে, এজন্য সে যবানকে বলে যে, তুমি সোজা থাক, অন্যথায় তোমার কর্মকান্ডের কারণে আমরাও বিপদে ফেঁসে যাব। এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে এই অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জিহ্বাকে সম্বোধন করে? হতে পারে যে, বাস্তবেই বলে। কেননা এটা অসম্ভব কিছু নয় যে, আল্লাহ তায়ালা ওই অঙ্গসমূহকে বলার শক্তি দান করেন। যার ফলে তারা জিহ্বার সঙ্গে কথাবার্তা বলে। কেননা জিহ্বাকে তো আল্লাহ তায়ালাই বলার শক্তি দিয়ে থাকেন এবং কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা ওই অঙ্গসমূহকেও কথা বলার শক্তি দিবেন।

কিয়ামতের দিন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কথা বলবে: বিগত শতাব্দীতে ন্যাচারিলিজমের বড়ই জোর ছিল এবং এ ন্যাচারিলিস্টরা মুজাযাকে অস্বীকার করত। তারা বলত যে, এটাতো প্রকৃতিবিরোধী। এটা কীভাবে হতে পারে? এক ব্যক্তি হজরত থানভী (রহ.)-কে জিজ্ঞেস করল যে, এই যে কোরআন শরীফে এসেছে কিয়ামতের দিন হাত পা সাক্ষ্য দেবে, কথা বলবে। আসলে এগুলো কীভাবে সাক্ষ্য দেবে? তাদের তো কোনো জিহ্বা নেই এবং জিহ্বাবিহীন কথা কীভাবে বলবে? তখন হজরত থানভী (রহ.) জিজ্ঞেস করলেন যে, আচ্ছা বলতো, জিহ্বা জিহ্বা ছাড়া কীভাবে কথা বলে? এ জিহ্বাটিতো গোশতের একটি টুকরো। তার তো পৃথক কোনো জিহ্বা নেই। কিন্তু তারপরও বলব, যখন আল্লাহ তয়ালা গোশতের হাড্ডিবিহীন টুকরাকে কথা বলার শক্তি দিয়ে দিলেন, তখনই তা বলতে লাগল। যদি আল্লাহ তায়ালা এ শক্তিকে শ্লথ করে দেন তখন বলা বন্ধ করে দেবে। আর এই বলার শক্তি যখন আল্লাহ তায়ালা হাতকে দেবেন, তখনই হাত বলতে থাকবে। পা’কে দিলে তখন পা বলতে থাকবে।

যাহোক এটি বাস্তবেও হতে পারে যে, সকালে অঙ্গগুলো জিহ্বার সঙ্গে কথা বলে এমনভাবে। এটিও হতে পারে যে, এটি একটি উপমা মাত্র। এই সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেহেতু জিহ্বার অধীনস্থ এজন্য জিহ্বাকে সঠিক রাখার জন্য চেষ্টা কর।

তাই এ জিহ্বার  সংরক্ষণ বড়ই প্রয়োজন। যতক্ষণ মানুষ এর ওপর নিয়ন্ত্রণ না আনতে পারবে এবং গুনাহ থেকে না বাঁচাবে ততক্ষণ পর্যন্ত সে সফল হতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে এই জিহ্বার সংরক্ষণ করার এবং এটাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার তাওফীক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

Related Posts

Add Comment