অভ্র এখন কী করবেন?

ইয়াঙ্গুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮ মে সন্ধ্যায় রানওয়ে থেকে বিমানের ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজটি ছিটকে গেলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যান আরোহীরা। তাঁদের মধ্যে সবাই আতঙ্কে, ভয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন। তখন বিমানের কেবিনে চলাচলের জায়গায় পড়ে ছিলেন ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস ফারজানা গাজী অভ্র। সেখান থেকে ওঠার চেষ্টা করলেও দাঁড়াতে পারছিলেন না তিনি। অভ্র তখন ধরেই নিয়েছিলেন, বিমানটি কিছুক্ষণ পরই আগুন ধরে বিধ্বস্ত হয়ে যাবে। নিজের যখন বাঁচার আশা নেই, তাই অন্যদের প্রাণরক্ষার চেষ্টা করেন ২৬ বছর বয়সী মেয়েটি। বিমানটির বেশ কয়েকজন যাত্রীর কাছ থেকে এসব কথা জানা গেছে। তাঁরা জানান, বিমানের কেবিনে শুয়ে থেকে চিৎকার করে অভ্র বলেন, ‘আপনারা আগে বের হওয়ার চেষ্টা করুন। বিমানের দরজা খুলন। বাঁ ও ডান দিকে দুটি দরজা রয়েছে।’ বাঁ পাশের দরজা না খোলায় উড়োজাহাজের ডান দিকের দরজা খোলার পদ্ধতি যাত্রীদের বলতে থাকেন অভ্র। দরজা খোলার পর যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। আর হাঁটাচলার ক্ষমতা না থাকায় স্ট্রেচারে শুইয়ে অভ্রকে বিমানবন্দরে আনা হয়।

ইয়াঙ্গুনের হাসপাতালে দুদিন চিকিৎসার পর গত শুক্রবার রাতে অভ্রসহ দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটির পাইলট, কেবিন ক্রু, গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার, চার যাত্রীসহ মোট ১০ আরোহীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সবাই সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারছেন বলে জানায় বিমান কর্তৃপক্ষ। তবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্ট্রেচারে শুইয়েই অ্যাম্বুলেন্সে করে অভ্রকে রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১২ মে অভ্রর অস্ত্রোপচার করা হয়। অ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যাওয়াকে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখন শারীরিক অবস্থা ভালো। গতকাল মঙ্গলবার থেকে তাঁকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এই রোগীকে তিন-চার দিন পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে।

অভ্রর পরিবারের সদস্যদের দাবি, তিনি আর কখনোই ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেসের কাজ করতে পারবেন না। হাঁটাচলা করতে পারলেও এই পেশার জন্য দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, যা অভ্রর পক্ষে করা একেবারেই অসম্ভব। এ কথা অ্যাপোলো হাসপাতালের চিকিৎসকেরা অভ্র ও তাঁর পরিবারকে জানিয়ে দিয়েছেন বলে তাঁরা জানান।

অভ্রর বরাত দিয়ে তাঁর ভাই নাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বিমানটি ছিটকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভ্র পড়ে যান। তখনই তাঁর মেরুদণ্ডের হাড়ে চিড় ধরে যায়। একটি হাড় ভেঙে যায়। চিড় ধরা হাড়ে রক্তক্ষরণও হয়েছিল। সে কারণে অ্যাপোলো হাসপাতালে অভ্রর অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছে। চেতনানাশক ইনজেকশনের কার্যক্ষমতা কেটে যাওয়ার পর ওর মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা হয়েছিল। ব্যান্ডেজ খুলে ড্রেসিং করানো হয়েছে। গতকাল থেকে ফিজিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে অভ্রকে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেসের কাজ করা তাঁর পক্ষে কখনোই সম্ভব হবে না। নতুন জীবন ফিরে পাওয়াটাই বড় পাওয়া বলে মনে করছেন অভ্র।

নাহিদ হোসেন জানান, তাঁদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে অভ্র সবার বড়। ২০১৫ সালের পড়াশোনা শেষ করে বিমানে ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস হিসেবে যোগ দেন অভ্র। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও অভ্রর মতো ১৪৫ কেবিন ক্রুর চাকরি স্থায়ী করেননি বিমান কর্তৃপক্ষ। ৮৯ দিনের ভিত্তিতে (প্রতি ৮৯ দিন পরপর মেয়াদ বাড়ানো হয়) অস্থায়ী কেবিন ক্রু হিসেবেই চাকরি করে যাচ্ছেন তাঁরা। চার বছরের চাকরিতে তাঁদের মূল বেতন ২১ হাজার টাকাই রয়েছে।

অভ্রর সহকর্মীরা জানান, স্থায়ী কেবিন ক্রুরা ৬৫ ঘণ্টা টানা ফ্লাইটে থাকলেই খাবারের বিল পান ১ হাজার ২০০ মার্কিন ডলার। অতিরিক্ত সময় হলে প্রতি ঘণ্টার জন্য আরও ১৮ ডলার সম্মানী তাঁরা পান। সপরিবারে ফ্রি বিমান টিকিট, সাপ্তাহিক ছুটি, বার্ষিক ছুটি, উৎসব ভাতা, চিকিৎসা ভাতাসহ সব সুবিধাই পাচ্ছেন স্থায়ী কেবিন ক্রুরা।

ডিউটি রোস্টারে অস্থায়ী কেবিন ক্রুদের সাপ্তাহিক ছুটির দিন লেখা থাকলেও তাঁদের স্ট্যান্ডবাই হিসেবে রাখা হয়। প্রয়োজনে তাঁদের ফ্লাইটে হাজির থাকতে হয়। এর জন্য ভাতা দেওয়া হয় না। শ্রম আইন অনুযায়ী কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না অস্থায়ী কেবিন ক্রুরা। তাঁদের ক্ষেত্রে নৈমিত্তিক, বার্ষিক, অসুস্থতাজনিত ও মাতৃত্বকালীন ছুটিও নেই। অস্থায়ী কেবিন ক্রুদের ৮৯ দিন পরপর তাঁদের চাকরি নবায়ন করা হয়। কিন্তু পরিচয়পত্রে কার্ডের মেয়াদ তিন বছর উল্লেখ করে থাকে বিমান। অস্থায়ী কেবিন ক্রুরা নিয়মিত অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে দায়িত্ব পালন করছেন। নিয়মানুবর্তিতা, কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কারণে ভিভিআইপি ফ্লাইটগুলোতেও রাখা হচ্ছে অনেক অস্থায়ী কেবিন ক্রুকে।

৮ মে বিমান দুর্ঘটনার পর ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে আনা হয় বিমানের ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস ফারজানা গাজী অভ্রকে। ছবি: সংগৃহীত
৮ মে বিমান দুর্ঘটনার পর ইয়াঙ্গুন বিমানবন্দরে আনা হয় বিমানের ফ্লাইট স্টুয়ার্ডেস ফারজানা গাজী অভ্রকে। ছবি: সংগৃহীত

অভ্রর সহকর্মীরা জানান, বিমানের রোস্টার অনুযায়ী ৮ মে অভ্রর অভ্যন্তরীণ রুটে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও সৈয়দপুরের ফ্লাইট ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে তাঁকে সকালে শিডিউল পরিবর্তন করে ইয়াঙ্গুনের ফ্লাইটে পাঠানো হয়।

অভ্রর পরিবারের সদস্যরা জানান, যত দিন চিকিৎসা চলবে, তত দিনও একটি টাকাও অভ্র পাবেন না। অস্থায়ী চাকরির কারণে স্থায়ী কর্মীদের আনুষঙ্গিক কোনো সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। চাকরি করতে না পারলে খালি হাতেই বিমান ছাড়তে হবে তাঁকে।

অভ্রর চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিমানের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অভ্রর শারীরিক অবস্থা আগের মতো ফিরে আসতে পারবে কি না, সে ব্যাপারে চিকিৎসকেরাই ভালো বলতে পারবেন। তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য সব ব্যবস্থাই নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমারের আহত এক যাত্রীকে ইয়াঙ্গুন থেকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুর পাঠিয়েছে বিমান। খবরঃ প্রথম আলো 

অভ্র আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা পাবেন কি না, তা জানতে চাইলে ক্যাপ্টেন ফারহাত জামিল বলেন, ‘কত নিয়মকানুনই তো আছে। তবে সেগুলো এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’

Related Posts

Add Comment