অগ্নিঝুঁকিতে পুরান ঢাকার অনেক বাড়ি ও মার্র্কেট

পুরান ঢাকার বংশাল, কোতোয়ালি ও চকবাজার থানা এলাকায় শত শত আবাসিক বাড়ি ও মার্কেট অগ্নি ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব ভবনে আধুনিক অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।

উপরন্তু একই বাড়িতে আবাসিক ও নিচতলায় জুতা এবং বিভিন্ন প্লাস্টিক পণ্যের কারখানা ভাড়া দিয়েছে বাড়ির মালিকরা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে বঙ্গবাজার এলাকায় কাঠ দিয়ে তৈরি ৩ তলাবিশিষ্ট মহানগর কমপ্লেক্স ও বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স নামে দুটি মার্কেট। এ মার্কেট দুটিতে প্রবেশ ও নির্গমন পথ সরু এবং সংকীর্ণ। ওই মার্কেটগুলোতে যে কোনো মুহূর্তে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। সরেজমিন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, বঙ্গবাজার এলাকায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের সামনে ৩ তলাবিশিষ্ট বিশাল একটি কাঠের মার্কেট রয়েছে। এ মার্কেটটি বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স নামে পরিচিত। এ মার্কেটের সরু গলির ভেতর হাজার হাজার দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। দোকানিরা গলিতেই মালামালের পসরা সাজিয়ে বসে। দোকানের কারণে প্রতিটি গলিপথ একজন মানুষের যাতায়াত করতেই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মার্কেটের ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল কাঠের সিঁড়ি বানিয়ে দোতলায় দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। একই সিঁড়ি দিয়ে ওপরের দিকে উঠতেই দেখা গেল মসজিদ, টয়লেট ও মার্কেটের অফিস রুম বানানো হয়েছে।

বাইরে থেকে এটিকে একতলা মার্কেটই ভাববেন অনেকে। মার্কেটের প্রত্যেকটি গলিপথ সরু হওয়ায় জরুরি কোনো বহির নির্গমন পথ রাখা হয়নি। এদিকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স পেরিয়ে পুলিশ সদর দফতরের গা ঘেঁষে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে একটি মার্কেট। এ মার্কেটটির নাম মহনগর কমপ্লেক্স। ওই মার্কেটে প্রায় হাজারেরও অধিক দোকান রয়েছে।

এ মার্কেটটির ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, কাঠের ওপর দোতলা মার্কেট। কাঠের খুঁটির ওপর আবার তৃতীয়তলা নির্মাণ করা হয়েছে। ৩য়তলায় মার্কেটের অফিস কক্ষ ও সিকিউরিটি গার্ডদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ওই মার্কেটের একাধিক দোকানি নাম না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রেলওয়ের জায়গায় কাঠ দিয়ে এ মার্কেট নির্মাণ করে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায় এসব দোকান বিক্রি করেছে। এখন ব্যবসায়ীরা আগুনের ঝুঁকি নিয়েই এখানে ব্যবসা করছে।

বঙ্গবাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হুমায়ুন আহমেদের মুঠোফোনে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি পরে মার্কেটের অফিসে যোগাযোগ করতে বলেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর কমপ্লেক্সের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমরা অগ্নি নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়েছি। আমাদের মার্কেটে কোনো সমস্যা হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, নগরীর পুরান ঢাকার বংশাল থানা এলাকার আলুবাজার, সিদ্দিকবাজার, বংশাল রোড, আগামাসি লেন, পাতলা খান লেন, কোতোয়ালি থানা এলাকার মিটফোর্ড, আরমানিটোলা, ওয়াইজঘাট, সদরঘাট ও চকবাজার এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে সরু গলির ভেতর অসংখ্য বহুতলবিশিষ্ট আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

এসব এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির নিচতলায় বিভিন্ন প্রকার প্লাষ্টিকদ্রব্য ও গোডাউন ভাড়া দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সেবা সংস্থার তার ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সরু গলির ভেতর। অনেক স্থানে বিল্ডিংয়ের গা বেয়ে বহুদূর পর্যন্ত বিদ্যুতের তার দিয়ে লাইন সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এসব লাইনে প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

অগ্নি ঝুঁকিতে থাকা এসব ভবন কখনও অগ্নিকাণ্ড সংগঠিত হলে নিমতলী ও চুড়িহাট্টার চেয়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আগামাসি লেনের স্থায়ী বাসিন্দা আলতু মিয়া যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকার অধিকাংশ রাস্তা সরু গলি। এসব গলিতে রিকশা চলাচল করাও দায়। এর ওপর বাড়ির মালিকরা জুতা স্যান্ডেলের কারখানা, প্লাস্টিক দিয়ে বানানো বিভিন্ন খেলনাদ্রব্যের কারখানাসহ বিভিন্ন পণ্যের গোডাউন ভাড়া দিয়ে রেখেছে। অনেকে সরু গলির ভেতর বহুতলবিশিষ্ট ভবন নির্মাণের অনুমতি না দিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাজউকের কাছে লিখিত দেয়ার কথা জানান অনেকে। এছাড়া নতুনভাবে নীতিমালা করে জমি অধিগ্রহণ করে রাস্তাগুলো সম্প্রসারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইন্টেনেন্স) একেএম শাকিল নেওয়াজ যুগান্তরকে বলেন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ছোট পরিসরে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন স্থাপন করার জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে (ডিএসসিসি) চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া যেকোনো অগ্নি ঝুঁকি মোকাবেলা করতে জনসচেতনতার ওপর জোর দেন এ কর্মকর্তা।তিনি বলেন, বঙ্গবাজারের জরাজীর্ণ এ মার্কেট ভেঙে ফেলতে সিটি কর্পোরেশনকে অসংখ্যবার চিঠি দেয়া হয়েছে। কিন্তু তারা তা মানেনি। এজন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর মার্কেটটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে। ডিএসসিসি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স ভেঙে ফেলে ওই স্থানে একটি বহুতলবিশিষ্ট মার্কেট নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। অচিরেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হবে বলে জানান তিনি।

Related Posts

Add Comment