বিজেএমসির গোডাউনে ৭০০ কোটি টাকার পণ্য, ক্রেতা নেই

প্রতি বছর কয়েক শ কোটি টাকা লোকসান দেওয়া বিজেএমসির আয়-ব্যয়ের স্বাভাবিক চিত্র। এমন নাজুক পরিস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো ধরনের চাহিদা ছাড়াই ৭০০ কোটি টাকার পণ্য বানিয়ে বসে আছে। যেখানে আছে ৬৪ হাজার ৪০১ টন বস্তা, দামের হিসাবে যা ৫০০ কোটি টাকার বেশি। আর এই অবিক্রীত বস্তার চাপেই বিজেএমসির অবস্থা নাজুক।

বস্তার এই চাপ থেকে বিজেএমসি (বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন) যে সহসা নিস্তার পাবে, সেই লক্ষণও নেই। কারণ আপাতত আন্তর্জাতিক বাজারে বস্তার চাহিদা নেই বললেই চলে। আর স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে গেলে খরচের অর্ধেকও ফিরে পাওয়া যাবে না। তার কারণ বেসরকারি পাটকলগুলো বস্তা বানিয়ে থাকে বিজেএমসির অর্ধেক দামে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এবং বিজেএমসি সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বিজেএমসির অধীনে বর্তমানে ২২টি পাটকল এবং পাটকল নয় এমন তিনটি প্রতিষ্ঠান আছে। গত ১০ বছরে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র একবারই লাভে যেতে পেরেছিল। বাকি সব বছরই লোকসান দিয়েছে। একই সময়ে লোকসানের এই ধারা থেকে বেরিয়ে আনতে সরকার প্রতিষ্ঠানটিকে ৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে। বলেছে, বস্তা বাদ দিয়ে অন্য পণ্য বানাতে হবে, যার চাহিদা বাজারে আছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তার কারণ পাটকলগুলোর শ্রমিকেরা একমাত্র বস্তা বানাতেই পারদর্শী, অন্য কিছু নয়। যার ফলশ্রুতিতে গত তিন বছরে সরকারি গুদামে জড়ো হয়েছে ৭০০ কোটি টাকার পণ্য। বস্তা ছাড়াও চাহিদাহীন এসব পণ্যের মধ্যে আছে পাটের তৈরি হালকা মোলায়েম কাপড়, কার্পেট ব্যাংকিং ক্লথ (কার্পেটের ভেতরে থাকে এমন কাপড়) ও পাটের সুতা।

বিজেএমসির মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) আবদুল মালেক বলেন, মূলত বস্তা বিক্রি না হওয়াতেই বিজেএমসির লোকসান বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় বিজেএমসির কর্মকর্তারা বসে নেই। তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন যাতে বস্তাগুলো দ্রুত বিক্রি করা যায়।

কোন মিলে কী পরিমাণ বস্তা:

বিজেএমসির তথ্য অনুযায়ী, তাদের ১৬টি মিল গত কয়েক বছরে ৬৪ হাজার ৪০১ টন বস্তা তৈরি করেছে। মূলত আফ্রিকার দেশ সুদানের চাহিদা মাথায় রেখে তারা এসব বস্তা তৈরি করে। কিন্তু গত জানুয়ারি থেকে সুদানে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হলে বিজেএমসির সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। 
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, দীর্ঘদিন গুদামে থাকলে বস্তার মান নষ্ট হয়ে যাবে। এ অবস্থায় তারা স্থানীয় বাজারে বস্তা বিক্রি করার চিন্তাভাবনা করছেন। কিন্তু তাতেও স্বস্তি নেই। কারণ তাতে লোকসান গুনতে হবে ৩০০ কোটি টাকার মতো।

বিজেএমসি থেকে জানা যায়, খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ১৮৮ টন বস্তা তৈরি করা হয়েছে। অন্যান্য মিলের মধ্যে বাংলাদেশ জুট মিলে ৩ হাজার ৮৪০ টন, করিম জুট মিলে ২ হাজার ৭০৬ টন, লতিফ বাওয়ানিতে ৪ হাজার ৭৬৫ টন, ইউএমসিতে ৪ হাজার ৭০১ টন, রাজশাহী জুট মিলে ২ হাজার ৩১৭ টন, জাতীয় জুট মিলে ৬ হাজার ৮৬ টন, আমিন জুট মিলে ৫ হাজার ২৫৬ টন, গুল আহমেদ জুট মিলে ৩ হাজার ১২১ টন, হাফিজ জুট মিলে ৫ হাজার ২৪ টন, আলিম জুট মিলে ২ হাজার ১৪১ টন, ইস্টার্ন জুট মিলে ১ হাজার ৬৫৩ টন, প্লাটিনাম জুবিলীতে ৫ হাজার ৭৯৩ টন, স্টার জুট মিলে ২ হাজার ২৯২ টন, খালিশপুর জুট মিলে ৫ হাজার ৩৪৯ টন এবং দৌলতপুর মিলে ১ হাজার ১৬৯ টন।

মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, মজুত বস্তা যে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হবে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। আর দেশীয় বাজারে বিক্রি করতে গেলে বিজেএমসিকে ব্যাপক লোকসান গুনতে হবে এবং রক্ষা পেতে হলে শেষ পর্যন্ত তাই করতে হবে।

১০ বছরে ৩৮০৫ কোটি টাকা লোকসান:

অর্থনৈতিক সমীক্ষার প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১০ বছরে বিজেএমসির মোট লোকসান ৩ হাজার ৮০৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২০০৮-০৯ সালে লোকসান ২৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, ২০০৯-১০ সালে ২২০ কোটি ৩১ লাখ, ২০১১-১২ সালে ৬৬ কোটি ৩৯ লাখ, ২০১২-১৩ সালে ৩৮৪ কোটি ৭৫ লাখ, ২০১৩-১৪ সালে ৪৯৬ কোটি ৭৫ লাখ, ২০১৪-১৫ সালে ৭২৬ কোটি ৫ লাখ, ২০১৫-১৬ সালে ৬৫৬ কোটি ৩০ লাখ, ২০১৬-১৭ সালে ৪৮০ কোটি ৯৪ লাখ এবং ২০১৭-১৮ সালে ৪৮৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। 
তবে ২০১০-১১ অর্থবছরে বিজেএমসি ১৪ কোটি ৫৯ লাখ টাকা লাভ করেছে।

বিজেএমসির কর্মকর্তাদের মতে, সরকারি পাটকলগুলোতে শ্রমিকের মজুরি বেশি। তাদের বয়স বেশি এবং শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের উৎপাদন ক্ষমতাও কম। তা ছাড়া এসব শ্রমিকেরা বস্তা ছাড়া অন্য কোনো পণ্য বানাতে জানে না। যে কারণে সরকারি পাটকলগুলোতে প্রতিবছর লোকসান হচ্ছে।

জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, বিজেএমসি দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলে এসেছে। এই অনিয়ম বন্ধ করতে পারলে লোকসান কমে যাবে। বিজেএমসি লোকসানের জন্য শ্রমিকদের দায়ী করে। এই প্রবণতাও ঠিক নয়। আমি মনে করি, বিজেএমসির ভেতরের দুর্নীতি দূর এবং স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে লাভ করা সম্ভব।

কোন পাটকলের কত লোকসান:

বিজেএমসির হিসাব অনুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারের মালিকানাধীন ২৫টি মিলের একটিও লাভের মুখ দেখেনি। এর মধ্যে বাংলাদেশ জুট মিলের লোকসান ৩০ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, করিম জুট মিলের ২৭ কোটি ৪১ লাখ, লতিফ বাওয়ানির ২৮ কোটি ৪৮ লাখ, ইউএমসি জুট মিলের ৩৬ কোটি ৫০ লাখ, রাজশাহী জুট মিলের ১৯ কোটি ৫ লাখ, জুটোফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজের ৫ লাখ, জাতীয় জুট মিলের ৬ কোটি ৯ লাখ, আমিন জুট মিলের ৩৯ কোটি ৬০ লাখ, গুল আহমেদ জুট মিলের ১৪ কোটি ৭৩ লাখ, হাফিজ জুট মিলের ১৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। খবরঃ প্রথম আলো

এমএম জুট মিলের ৩ কোটি ৮১ লাখ, আরআর জুট মিলের ২ কোটি ১১ লাখ, বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরির ৩ কোটি ৯৩ লাখ, কেএফডি লিমিটেডের ৬ কোটি ৭১ লাখ, গালফ্রা-হাবিব লিমিটেডের ৩ কোটি ৪১ লাখ, মিলস ফার্নিশিংস লিমিটেডের ২০ লাখ, কার্পেটিং জুট মিলের ৫ কোটি ৬৬ লাখ, যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজের ১৯ কোটি ৮৬ লাখ, আলীম জুট মিলের ১১ কোটি ৮০ লাখ, ইস্টার্ন জুট মিলের ১৪ কোটি ৯৯ লাখ, ক্রিসেন্ট জুট মিলের ৮২ কোটি ৮৩ লাখ, প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলের ৪৪ কোটি ৯৪ লাখ, স্টার জুট মিলের ১৮ কোটি ৭৬ লাখ, খালিশপুর জুট মিলের ১৭ কোটি ১১ লাখ এবং দৌলতপুর জুট মিলের ৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে লোকসানের পরিমাণ ৪৬৬ কোটি ২২ লাখ টাকা।

Related Posts

Add Comment