অরক্ষিত রেল ক্রসিং, বাড়ছে দুর্ঘটনা

অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ের কারণে সারাদেশে বাড়ছে রেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় যত প্রাণহানি হচ্ছে তার ৮৯ শতাংশই ঘটছে অরক্ষিত ক্রসিংয়ের কারণে। সারাদেশে ২ হাজার ৯৫৫ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং রয়েছে ২ হাজার ৫৪১টি। যার মধ্যে বৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১৪শ’। বাকি ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান না থাকায় এসব স্থান মৃত্যু ফাঁদে পরিনত হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ এসব লেভেল ক্রসিংগুলোতে রেল কর্তৃপক্ষ শুধু ‘সামনে রেলক্রসিং, সাবধানে চলাচল করুন’ সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।

রেলওয়ে ইনফরমেশন বুকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৪শ’ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে গেটম্যান আছে মাত্র ৪৬৬টিতে। বাকি ৯৪৬টি লেভেল ক্রসিংয়ের কোনো গেটম্যান নেই।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানায়, রেলওয়ে ও রেল মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্থানীয় জনগণ দিন দিন লেভেল ক্রসিং বৃদ্ধি করেই চলেছে, তাই সব লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান দেয়াও সম্ভব হচ্ছে না।

এদিকে, সারাদেশে রেলের ১ হাজার ৪৩৫টি লেভেল ক্রসিংয়ে কোনো গেটম্যান বা কর্মী না থাকায় মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে এসব স্থান। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, অনেক রেল ক্রসিংয়ে গাড়ির গতিরোধে ব্যবহার হচ্ছে বাঁশ। এসব গেটের সামনে নেই কোন সিগন্যাল লাইট। রাজধানী ও আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে লেভেল ক্রসিং আছে ৫৮টি। যার ২৩টিই অনুমোদনবিহীন, নেই গেটম্যানও। গত ৩ বছরে শুধু রাজধানীতেই ৯৫টি ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন দেড় শতাধিক। তবুও টনক নড়ছে না রেল কর্তৃপক্ষের।

রেল ক্রসিং না থাকায় গত ১৮ জুলাই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বর-কনেসহ ১১ বরযাত্রী প্রাণ হারায়। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বেতকান্দিতে অরক্ষিত রেল ক্রসিংয়ে ঢাকাগামী পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসে থাকা বর-কনেসহ ১১ জন নিহত হয়। এ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে রেল কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে সেখানে দু’জন গেটম্যান নিয়োগ দেয়া হয়েছে।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার রেলপথ। খিলগাঁও, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, বনানী ও কুড়িল রেলক্রসিং এর মধ্যে কুড়িল ক্রসিংকে ‘সবচেয়ে বিপজ্জনক’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে রেলওয়ে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এরই মধ্যে এসব ক্রসিংগুলোর ৯টিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা করেছে। এসব ক্রসিংয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। নগরীতে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে যে ৯টি রেলক্রসিং চিহ্নিত করা হয়েছে সেগুলো হলো- মগবাজার, মালিবাগ, তেজগাঁও, সায়েদাবাদ, বিএফডিসি, বনানী, কুড়িল, মহাখালি ও খিলগাঁও রেল ক্রসিং।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য মতে, এই পথে গত পাঁচ বছরে আড়াই শতাধিক ব্যক্তি ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা গেছেন।

এদিকে, রেলওয়ে সূত্র জানায়, শুধুমাত্র ঢাকার কুড়িল রেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০বার ট্রেন চলাচল করে। নগরীতে শুধু রেল ক্রসিংই অরক্ষিত নয়, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে রেললাইনও।

অনুসন্ধানে জানা যায়, দীর্ঘ আট-দশ বছর ধরে রেলের গেটম্যান হিসেবে একই জায়গায় একই ব্যক্তি কাজ করছেন। এর ফলে অন্যের কাছে দায়িত্ব দিয়ে অনেকে চলে যান। ওই ব্যক্তির দায়িত্বে অবহেলায় ঘটছে অনেক দুর্ঘটনা।

তবে গেটম্যানদের অভিযোগ, বছরের পর বছর অস্থায়ী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও তাদের স্থায়ী করা হয়না। স্থায়ী করার কোনো খবর না থাকলেও নতুন নিয়োগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে রেল কর্তৃপক্ষ। এ কারনে অনেক সময় হতাশায় দায়িত্বে অবহেলা হয়ে যায়।

বাংলাদেশ রেলওয়ের উপ-পরিচালক (প্রকৌশল) কাজী মোস্তাফিজুর রহমান ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, খুব শিগগিরই অবৈধ রেল ক্রসিংগুলোকে বৈধ করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। আর লেভেল ক্রসিং গেটগুলোকে অটো অপারেড করা হবে। এর ফলে ট্রেন আসলে গেটগুলো অটো বন্ধ হয়ে যাবে আর ট্রেন চলে গেলে আবার খুলে যাবে। এতে দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে।

অরক্ষিত রেল ক্রসিং সম্পর্কে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কোন লেভেল ক্রসিং অবৈধ বলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এর দায় এড়াতে পারে না। জনগণ বা এলজিইডি যদি কোন লেভেল ক্রসিং তৈরি করেও থাকে সেটা রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব তার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।

সিরাজগঞ্জের দুর্ঘটনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, লোকবল বা প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে বলে দায় এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব না। এটি দেখা দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। তবে এলাকাবাসী বা এলজিইডি যেই রেল ক্রসিং তৈরি করছে সেটা রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া উচিত। খবরঃ ডেইলি বাংলাদেশ ডট কম 

Related Posts

Add Comment